অশ্বগন্ধা Ashwagandha—প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সঞ্জীবনী শক্তি, যা হাজার বছর ধরে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে পরিচিত। মানসিক প্রশান্তি আনা, শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট রাখতে এর কোনো বিকল্প নেই। একে ‘ইন্ডিয়ান জিনসেং’ বলা হয় কারণ এটি শরীরের ক্লান্তি দূর করে নতুন প্রাণশক্তি জোগায়। আপনার ভেষজ বাগানে একটি অশ্বগন্ধা গাছ থাকা মানেই সুস্বাস্থ্যের একটি স্থায়ী উৎস থাকা।
অশ্বগন্ধা–র পরিচিতি ও পটভূমি
অশ্বগন্ধা (বৈজ্ঞানিক নাম: Withania somnifera) দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার একটি আদি ওষুধি উদ্ভিদ। এই গাছের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা ও নামকরণ করেন আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞানের জনক ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus) ১৭৫৩ সালে। তবে এর গুণের কথা প্রথম লিপিবদ্ধ হয় প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মূল কারিগর মহর্ষি চরক এবং সুশ্রুত-এর সংহিতায়। বর্তমানে আমেরিকার ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন (NCBI) অশ্বগন্ধার স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা কমানোর ক্ষমতার ওপর অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও স্বীকৃতি প্রদান করেছে।
বিবরণ
অশ্বগন্ধার মূল, পাতা, ফুল, ফল, ছাল ও ডাল—সব অংশই ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গাছটি সাধারণত ৩৫–৭৫ সেমি (১৪–৩০ ইঞ্চি) পর্যন্ত লম্বা হয়, অর্থাৎ প্রায় দুই থেকে আড়াই হাত উঁচু। এটি শাখাবহুল উদ্ভিদ। এতে ছোট ছোট মটরের মতো ফল ধরে। ফুল আকারে ছোট, সবুজ রঙের এবং ঘণ্টার মতো আকৃতির। ফল পাকার সময় কমলা রঙের সঙ্গে কিছুটা লালচে ভাব দেখা যায়।
চাষ
অশ্বগন্ধা ভারতের শুষ্ক অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে চাষ করা হয়। এছাড়াও এটি নেপাল, চীন ও ইয়েমেনেও পাওয়া যায়। সূর্যালোকযুক্ত বা আংশিক ছায়াযুক্ত জায়গায় এবং শুষ্ক ও পাথুরে মাটিতে এই গাছ ভালো জন্মায়। বসন্তকাল অশ্বগন্ধা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
ভেষজ গুণ
অশ্বগন্ধা একটি শক্তিবর্ধক ভেষজ উদ্ভিদ। এর রস শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং পুরুষের শুক্রাণু বাড়াতে কার্যকর। অশ্বগন্ধার মূল ও পাতা স্নায়ুবিক বিভিন্ন রোগে উপকার আনে। দুধ ও ঘিয়ের সঙ্গে এর পাতা ফুটিয়ে খেলে শরীরে বল পাওয়া যায়।
যারা অনিদ্রা বা ইনসমনিয়ায় ভোগেন, তাদের জন্য অশ্বগন্ধা একটি উপকারী ভেষজ। ভালো ঘুমের জন্য অশ্বগন্ধার গুঁড়ো চিনির সঙ্গে ঘুমানোর আগে খাওয়া যেতে পারে। সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি পেতে অশ্বগন্ধার মূল গুঁড়ো করে খাওয়া হয়। চোখের ব্যথা কমাতেও অশ্বগন্ধা উপকারী।
ক্রনিক ব্রংকাইটিসের ক্ষেত্রেও অশ্বগন্ধা কার্যকর। এ ক্ষেত্রে অশ্বগন্ধার মূল বিশেষ পদ্ধতিতে পোড়ানো হয়। ছোট মাটির হাঁড়িতে মূল রেখে মুখ ঢেকে মাটি দিয়ে লেপে শুকিয়ে ঘুটের আগুনে পোড়ানো হয়। আগুন নিভে গেলে মূল বের করে ভালোভাবে গুঁড়ো করে আধা গ্রাম পরিমাণ মধুর সঙ্গে খেলে ক্রনিক ব্রংকাইটিসে উপকার পাওয়া যায়।
অশ্বগন্ধা মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতা দূর করতে সাহায্য করে। মাথা ঝিমঝিম করা, সংজ্ঞাহীনতা, অবসাদ ইত্যাদি সমস্যা কমায়। এটি মনোযোগ বাড়ায় এবং শরীরের ক্লান্তি দূর করে সঞ্জীবনী শক্তি ফিরিয়ে আনে।
অশ্বগন্ধার ফল অম্বল, অজীর্ণ, পেট ফাঁপা ও পেটব্যথা নিরাময়ে উপকারী। এটি যকৃতের জন্যও অত্যন্ত ভালো এবং হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। তবে অপরিশোধিত বা নিম্নমানের অশ্বগন্ধা গুঁড়ো হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং তলপেটে ব্যথা হতে পারে। তাই যাদের হজমশক্তি দুর্বল, তাদের অবশ্যই ভালো মানের অশ্বগন্ধা ব্যবহার করা উচিত।
রোগ ও পোকামাকড়
অশ্বগন্ধা গাছে কখনো কখনো স্টেমের খাঁটি অংশে কীট আক্রমণ করে, ফলে গাছের চেহারা রুক্ষ ও বাদামী হয়ে যায় এবং গাছ ধীরে ধীরে মারা যেতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাতা ঝরে পড়ে। ভারতে এই গাছে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কারমাইন লাল মাকড়সা মাইট (Tetranychus urticae)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিলিবাগ প্রজাতির Phenacoccus solenopsis এই উদ্ভিদের একটি নতুন পোকামাকড় হিসেবে দেখা গেছে।
অশ্বগন্ধা উদ্ভিদ থেকে উইথানোলাইড, উপক্ষার এবং বিভিন্ন সাইটিনডোসাইড আলাদা করা হয়েছে। এর উইথানোলাইডের গঠন Panax Ginseng-এর জিনসেনোসাইডের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। এ কারণেই অশ্বগন্ধাকে অনেক সময় “Indian Ginseng” বলা হয়।
ঐতিহ্যগত ঔষধ
অশ্বগন্ধার শুকনো গাছের গুঁড়ো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখনো এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই যে এটি নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা করে। চিকিৎসকেরা সাধারণত প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিকল্প হিসেবে অশ্বগন্ধা সেবনে উৎসাহ দেন না।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অশ্বগন্ধাযুক্ত সম্পূরক খাদ্য হিসেবে এটি বিক্রি করা হয়। তবে এসব সম্পূরকের কার্যকারিতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশে অশ্বগন্ধা চারা কোথায় পাবেন?
আপনি কি আসল ও উন্নত ওষুধি গুণের অশ্বগন্ধা চারা খুঁজছেন? অংকুর Ongkoor.com বাংলাদেশে অত্যন্ত আস্থার সাথে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির অশ্বগন্ধা চারা সরবরাহ করছে। আমরা আমাদের নিজস্ব নার্সারি থেকে সতেজ এবং রোপণের উপযোগী চারাগুলো বাছাই করে বিশেষ প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে ডেলিভারি দেই। ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত যেকোনো স্থান থেকে আপনি ঘরে বসেই অংকুর (Ongkoor.com) থেকে আপনার সুস্থতার সঙ্গী এই গাছটি অর্ডার করতে পারেন।
এই গাছের জনপ্রিয় ব্যবহার ক্ষেত্রসমূহ
অশ্বগন্ধা তার বহুমুখী গুণের কারণে বিভিন্ন জায়গায় অত্যন্ত জনপ্রিয়:
- হোম হার্বাল গার্ডেন: প্রতিদিনের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বাড়ির আঙিনা বা বারান্দায় এটি লাগানো হয়।
- ছাদ বাগান (বড় টবে): খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না বলে এটি ছাদ বাগানের জন্য আদর্শ একটি ওষুধি গাছ।
- ভেষজ খামার: বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অশ্বগন্ধা চাষ হচ্ছে।
- অফিস বা ইনডোর: চমৎকার সবুজ পাতা এবং ওষুধি গুরুত্বের কারণে অনেকে উজ্জ্বল আলোযুক্ত ইনডোরে এটি রাখতে পছন্দ করেন।
অশ্বগন্ধা গাছের যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ
১. সূর্যালোক: অশ্বগন্ধা প্রচুর রোদ পছন্দ করে। সরাসরি সূর্যের আলোতে এর শেকড়ের গুণাগুণ বৃদ্ধি পায়।
২. মাটি: জল নিষ্কাশন ভালো এমন বালু মিশ্রিত দোআঁশ মাটিতে এটি সবচেয়ে ভালো জন্মায়। জলাবদ্ধতা একদম সহ্য করতে পারে না।
৩. পানি: মাটি শুকিয়ে গেলে তবেই পানি দিন। অতিরিক্ত পানি এর শেকড় পচিয়ে ফেলতে পারে।
৪. সংগ্রহ: সাধারণত গাছ লাগানোর এক বছর পর এর শিকড় ওষুধি ব্যবহারের জন্য সংগ্রহের উপযুক্ত হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. অশ্বগন্ধার কোন অংশ ব্যবহার করা হয়?
প্রধানত এর শিকড় চূর্ণ করে ব্যবহার করা হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এর পাতা ও ফলও ওষুধি কাজে লাগে।
২. এটি কি টবে চাষ করা সম্ভব?
হ্যাঁ, ১০-১২ ইঞ্চির টবে খুব সহজেই অশ্বগন্ধা চাষ করা যায়। এটি খুব বেশি বড় হয় না, তাই ছোট জায়গার জন্য উপযুক্ত।
৩. অংকুর Ongkoor.com কি সুস্থ চারা ডেলিভারি দেয়?
অবশ্যই। আমাদের উন্নত প্যাকিং প্রযুক্তি নিশ্চিত করে যে চারাটি সতেজ অবস্থায় আপনার হাতে পৌঁছাবে।
৪. এটি মশা তাড়াতে কাজ করে কি?
এর পাতার তীব্র গন্ধ কিছু বিশেষ ধরনের পোকা দূরে রাখতে সাহায্য করে।







